Chakdah Natyajon’s ARANYAK : a review in
Bengali
Quite a few of my blog-readers have requested me to write in Bengali also, especially the theatre reviews. As my reviews in Desh is not being regularly published, so I thought I might as well also write my reviews and perhaps other essays also in Bengali in my blog. As a result, this is my first venture in Bengali blog writing. In this blog I am writing a short review on Chakdah Natyajon’s latest production of ARANYAK, premiered at AFA on 30 October, 2026.
চাকদহ নাট্যজন-এর আরণ্যকঃ একটি বিষাদময় অভিজ্ঞতা
বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটি যে-কোনও বাঙালীর কাছে যেন এক মন্ত্রমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা, এবং হেন
কোনও বাঙালী নেই, অন্তত আমাদের এবং তার পরের প্রজন্মের, যাঁর কাছে এই উপন্যাসটি
তাঁর যৌবনের অন্যতম প্রথম পাঠ ছিল না। কে না সত্যচরণ হতে চেয়েছিল? আবার
এই উপন্যাসটিই বেশ কয়েক দশক পর পড়তে বসলে উঠে আসে ভিন্ন অনুভূতি। রবীন্দ্রনাথের
গানের মত – এক এক বয়সে এক এক অর্থ নিয়ে তারা সামনে চলে আসে। এই একটি লেখার জন্যই বিভূতিভূষণের নোবেল পাওয়া উচিত ছিল,
কিন্তু হতভাগ্য সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এবং অযোগ্য অনুবাদ আমাদের এই ভাষাটাকে সে
ভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চের আলোকবৃত্তে আসতে দেয় না।
যাই
হোক, সুমন পালের আমন্ত্রণে চাকদহ নাট্যজন-এর প্রযোজনায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ
আরণ্যক নাট্যটির প্রথম অভিনয় দেখতে গিয়েছিলাম প্রচুর সংশয়,
দ্বিধা নিয়ে। তার কারণ এটি এমন একটি
উপন্যাস যার নায়ক এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র হল প্রকৃতি, তাকে মঞ্চে উপস্থিত করা কি সহজ
এক নাট্যনির্মাণ? প্রকৃতি – যে প্রকৃতি আমাদের প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়, তাকে বিভূতিভূষণ
এমন জীবন্ত করে মেলে ধরেন, যে তার ছবি মনের মধ্যে গেঁথে থাকে। তাই পাঠের সময়ে যে
ছবি তৈরি হয় প্রত্যেক পাঠকের মনে, তাকে থ্রী-ডাইমেনশনে ব্যক্ত করা অসাধ্য একটি কাজ।
তার ওপর এই ছবি এক একজন পাঠকের কাছে এক এক রঙে ধরা দেয়। অথবা বলা উচিত রঙের ভিন্ন
ভিন্ন শেড্-এ ধরা দেয়। সুতরাং তাকে ফিজ়িকালি তুলে ধরা এক আন্সারমাউন্টেবেল চ্যালেঞ্জ। মনে পড়ে
শম্ভু মিত্র বলেছিলেন সব সাহিত্যকেই নাট্যে আনা যায় না। ঠিক এমন কথাই সত্যজিৎ
রায়কে বলতে শোনা গিয়েছিল ‘আরণ্যক’ নিয়েই। বলেছিলেন সব লেখাই ছবি হয় না। তবে কাজটা
দেবাশিস করছেন বলে মনে হয়েছিল হয়তো একটা ভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টাতে বিভূতিভূষণকে
সম্পূর্ণ ভাবে না হোক তার ছায়াকে মঞ্চে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়,
ওই আড়াই ঘণ্টা সময় ধরে যা ঘটলো তা বিভূতিভূষণের প্যারোডি বললেও কম বলা হয়। কোনও নাট্য
দেখতে বসে এতটা হতাশ, এতটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছি বলে মনে পড়ে না। ধাক্কাটা বেশি লেগেছে
হয়তো বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসটি এতটাই মনের অন্তঃস্থলে প্রোথিত আছে বলে। তবে
সুমনের দল এবং দেবাশিসের প্রচেষ্টা তারিফ পাবে এই কঠিনতম কাজটি হাতে নেওয়ার সাহস, (নাকি
স্পর্ধা?) দেখানোর জন্য।
আসলে
এই ধরনের ডেসক্রিপ্টিভ উপন্যাসকে ড্রামাটাইজ় করার জন্য মূল লেখাটির পাঠের জন্য
যে পরিণত বোধের প্রয়োজন ছিল তা এই তরুণ প্রতিভাশালী নাট্যকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। দেবাশিসের
প্রতিভার পরিচয় পেয়েই বলছি এই কথা। আর কয়েক বছর যদি তিনি অপেক্ষা করতেন তা হলে
হয়তো দর্শককে তিনি ফুলকিয়া, লবটুলিয়া, বইহার অঞ্চল এবং সেখানকার বিচিত্র পরিবেশ, তাদের
ঐশ্বর্যশালী জীববৈচিত্র, সেখানকার সারা বছরের ঋতুগুলির নানান রূপ, এবং সর্বোপরি সেখানকার
হতদরিদ্র মানুষজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু সেদিন নাট্যটিতে আমরা
পেলাম ওই স্থানগুলির ওই মানুষগুলির উল্লেখ মাত্র।
উপন্যাসটি
পড়ার সময়ে একটা যে মেলানকোলি, একটা না পাওয়ার যন্ত্রণা, একটা হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর
জন্য আকুলতা, প্রান্তিক মানুষ আর অরণ্যরাজির জন্য হৃদয়ের রক্তক্ষরণ জাতীয়
অনুভবগুলি পাঠকের মনে থেকে যায় দীর্ঘ-দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে। বর্তমান কাজটিতে এইসবের
কণামাত্র উপলব্ধ হল না। উলটে বেশ কিছু অংশে ইন্টারপ্রিটেশনের এমন স্খলন দেখা গেল
যে মন ক্ষুণ্ণ না হয়ে পারল না। যেমন মটুকনাথ পাঁড়ের টোলের অংশটিতে, মটুকনাথকে
ক্লাউনিশ করে তোলা, অথবা তার না-খেতে-পাওয়া হতদরিদ্র ছাত্রদের অমন নিষ্ঠুর ভাবে
প্যাঁকাটি দিয়ে কাকতাড়ুয়ার চেহারা করে দেখানোর কী হেতু থাকতে পারে? অথবা সত্যচরণের
ছোট লাইনে ভাগলপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া দেখাতে খেলনার রেলগাড়ি নিয়ে দুই বয়সের
দুই সত্যচরণের অংশটি নার্সারি ক্লাসের কোনও পারফর্মেন্সকে মনে করিয়ে দেয়। বিভিন্ন
ব্যক্তির সঙ্গে সত্যচরণের ইন্টারঅ্যাকশনগুলিতেও পাওয়া গেল অগভীর, স্থূল সম্পর্কের আভাস
বিশেষ করে যেমন গাঙ্গোতা তরুণী মঞ্চীর সঙ্গে একটা অব্যক্ত প্রেমের আভাস নাট্যকার
রেখেছেন। সেই সম্পর্কটি কী শুধুই আমরা যাকে প্রেম বলি তাই? নাকি তার ঊর্ধে আর কিছু?
নাটুয়া কিশোর ধাতুরিয়ার অঙ্গভঙ্গিতে মেয়েলি ভাব থাকলেও সারাক্ষণ অমন নাচের ভঙ্গি সে
করে কেন তা বোঝা গেল না। অথবা শুধু বনকুলের ওপর নির্ভর করা কুন্তা যার মুখ দিয়ে কথা
সরে না, তাকে কি দর্শক সঠিক চেহারায় পেলেন? এক মুঠো ভাত যাদের কাছে কহিনূরের থেকেও
মহার্ঘ, তাদের দেখা কি দর্শক পেলেন? আর স্ক্রিপ্টে সব থেকে ক্ষতি হয়েছে দুই বয়সের
দুই সত্যচরণের রিপ্রেজে়নটেশনে। চরিত্রের এই দুই ইমেজ একে অপরের কমপ্লিমেন্টরি হওয়ার কথা। কিন্তু
দর্শক পেলেন একটি চরিত্রের দুই বাইনারি।
সামগ্রিক
উপস্থাপনা প্রায় ত্রুটিমুক্ত থাকলেও মঞ্চের সাজ বা আলোর কাজ অতি সাধারণ। ঋতুর
পরিবর্তন বা রাত দিনের তফাৎ অথবা বণাঞ্চল বা রুক্ষ প্রান্তর ইত্যাদি কী বোঝা গেল? তবে
আবহর কাজটি তারিফ পাবে যদিও যেসব গান ঢোকানো হয়েছে তা একেবারেই বিভূতিভূষণ বা সত্যচরণের
সঙ্গে যায় না। বিশেষ করে মঞ্চীদের বিদায় নেওয়ার অংশে সত্যচরণের গানটি তো ভয়ানক
ভাবে ‘আরণ্যক’-এর স্পিরিটের সঙ্গে বেখাপ্পা লাগে। তবে যে তিনজন সংগীতের দায়িত্বে ছিলেন
তাঁদের অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য। কলাকুশলীদের নাম না জানায় তা দেওয়া গেল না।
অভিনয়ে
প্রত্যেকেই তাঁদের নিজের নিজের চর্চিত রোলগুলি সুনিপুণ ভাবে সম্পাদন করেছেন। কয়েকটি
চরিত্রকে কেন উত্তুঙ্গ স্কেলে নির্দেশক বেঁধে দিয়েছেন তা বোঝা গেল না। এর ফলে এই চরিত্রগুলি
তাদের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। যুবক সত্যচরণের চরিত্রটিকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন
অভিনেতা। তাঁর সংলাপ উচ্চারণ, বিরামের ব্যবহার অথবা অভিব্যক্তি প্রকাশে শহুরে শিক্ষিত
মানুষের গাম্ভীর্যের ছাপ রেখেও পারিপার্শ্বিক মানুষজনের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়
করার সত্যচরণের যে আকাঙ্ক্ষা তাকে তুলে ধরতে পেরেছেন। মঞ্চীর চরিত্রের কাজটি দর্শকের
তারিফ পাবে। কুন্তা অথবা ধাতুরিয়াও নির্দেশকের নির্দেশনা মেনেই সম্পাদিত হয়েছে। যুগলপ্রসাদ, মটুকনাথ পাঁড়ে, রাজু পাঁড়ে বা রাজা দোবরু পান্না বা ভানুমতি চরিত্রগুলিও সেইভাবে সম্পাদিত হয়েছে। সুমন নিজে ধাওতাল সাহুর চরিত্রটি অসাধারণ দক্ষতায় মঞ্চে এনেছেন একটি
টিপিকাল ভোকাল ম্যানারিজ়মকে রেখে। তাঁর
নকছেদিও তারিফ পাবে।
তবে প্রযোজনার
যেটি সব থেকে বিষাদময় বিষয় সেটি হল মেঘনাদ ভট্টাচার্যর লেখক সত্যচরণ চরিত্রে
অভিনয়। এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে এতটা অসফল এতটা অপ্রস্তুত হতে দেখতে হবে তা কল্পনাও
করা যায় না। সংলাপ নির্ভর এই অভিনয়ে তিনি সংলাপ বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবার স্খলিত হয়েছেন,
ভুল শব্দ বলেছেন এমনকি মঞ্চ ব্যবহারেও তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তাঁর সংলাপ ছিল
মূল উপন্যাসের বর্ণনার সাধু ভাষা সুতরাং প্রথম থেকেই এক ধরনের আড়ষ্টতা আমরা দেখতে
পাই। সেই সংলাপের শব্দের ওপর মনোযোগ দিতে গিয়ে অভিনয়ের অন্য বিষয়গুলি যা স্বতঃপ্রনোদিত
ভাবে তাঁর এসে যায়, সেখানেও স্খলন নজরে পড়ে। একজন একনিষ্ঠ মেঘনাদ-ভক্ত হিসেবে এই
অভিজ্ঞতা আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে অত্যন্ত কষ্টের।
শেষ
করার আগে দর্শক সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হয়। আমি নিজে একজন নির্ভেজাল দর্শক বলেই এই
কথাগুলি বলার স্পর্ধা রাখি। সেদিন অ্যাকাডেমি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বহু অসাধারণ সব
নাটকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে নীচের তলাই ভর্তি হয় না। সব ক্ষেত্রেই যেটা দেখা যায়
সেটা হল নামের পেছনে লোকে দৌড়য়। এক্ষেত্রেও বোঝা গেল দেবাশিসের আছে এক বিরাট
অনুগামী সংখ্যা। মনে আছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কাজ দেখে ওঁর সঙ্গে দেখা
করতে গিয়ে বলেছিলুম, সৌমিত্রদা নব্বই সতাংশ দর্শক কিন্তু এসেছিলেন সৌমিত্রকে দেখতে,
নাটক দেখতে নয়। সৌমিত্রদা উত্তরে বললেন, না না একেবারেই ঠিক বলছ না সুব্রত। আমি একটু
লজ্জায় পড়ে গেলুম। উনি বললেন, ওটা নিরানব্বই শতাংশ হবে। সেদিনও অ্যাকাডেমিতে দেখলাম
বেশ কিছু ভ্রান্ত নাট্যাংশে দর্শক হাততালি দিয়ে উঠছেন অথবা বেখাপ্পা স্থানে উচ্ছ্বাস
প্রকাশ করছেন, বেশ কিছু করুণ অংশে যেমন মটুকনাথের টোলের অংশে দর্শক ওই কাকতাড়ুয়া সাদৃশ
ছাত্রদের দেখে হেসে উঠছেন, বা মঞ্চীর উদ্দেশ্যে সত্যচরণের প্রেমের গান গেয়ে ওঠাতে
হাততালি পড়ছে। আর সব শেষে এক প্রবীণ অভিনেতাকে যখন দেখলাম গড় হয়ে নাট্যনির্মাতাকে
প্রণাম করতে তখন বুঝতে আসুবিধে হল না যে প্রতিভাকে বিকশিত হতে সুযোগ দিই না আমরাই
যখন তাদের বেড়ে ওঠার সময়ে মাথায় তুলে ফেলি।